বাংলাদেশের ঈদ উৎসব

মুসলিম সংখ্যাগরিষ্ঠ দেশ হিসেবে ঈদুল ফেতর এবং ঈদুল আযহা বাংলাদেশে দুইটি প্রধাণ জনপ্রিয় উৎসব। মুসলমানদের ছাড়াও বিভিন্ন ধর্মের মানুষ এই উৎসব উপভোগ করে থাকে। ঈদ উপলক্ষে সরকারি অফিস আদালত সহ সারাদেশে সকুল প্রতিষ্ঠানে সাধারন ছুটই থাকে।

ঈদুল ফেতর

ঈদুল ফেতর বাংলাদেশের বৃহত্তম উৎসব। হিজরী ক্যলেন্ডার অনুযায়ী রমজান মাসের পর শাওয়াল মাসের প্রথম দিনে এই উৎসব পালন করা হয়। দীর্ঘ এক মাস রোজা ও আল্লাহর সুন্তষ্টি অর্জনের জন্য বিষেশ ইবাদত বন্দেগী পালনের পর এই উৎসব পালন করা হয়। রমজান মাসের রোজার পর এই উৎসব পালন হওয়ায় বাংলাদেশে এইটি রোজার ঈদ নামে পরিচিত।

ঈদের আযহা

বাংলাদেশের মুসলমাদের কাছে ঈদুল আযহ দ্বিতীয় বৃহত্তম উৎসব। হিজরী ক্যালেন্ডারের ১২দশ মাস জিলহজ্জ্বে এই উৎসব পালন করা হয়। পশু কুরবানীর মাধ্যমে এই ঈদ পালন করা হয় বলে এই ঈদ কুরবানীর ঈদ নামেও পরিচিত। হযরত ইবরাহিম (আ) তার পুত্র হযরত ইসমাইল (আ) আল্লাহর আদেশে তার সুন্তুষ্টির জন্যে কুরবানী করতে প্রস্তুত হয়েছিলেন বলে আল্লাহ তার প্রতি সুন্তষ্ট হয়ে ইসমাইল (আ) কে কুরবানীর পরিবর্তে ইবরাহিম (আ) এর কাছে একটি ভেড়া পাঠান এবং এইটি কুরবানীর জন্যে আদেশ করেন। হযরত ইবরাহিম (আ) এর এরুপ আল্লাহর আদেশ পালনের জন্য স্বেচ্ছায় তৈরী হয়ে যাওয়ার দৃষ্টান্ত অনুসারে সামার্থবান মুসলমানরা এই দিনে পশু কুরবানী করে। বাংলাদেশের মুসলমানরা এই দিনে গরু,ছাগল সহ বিভিন্ন গৃহপালিত পশু কুরবানী করে

ঈদুল ফেতর এবং ঈদুল আযহার মাঝে মূল পাথ্যর্ক হলো রোজা ও কুরবানী।এক মাস রোজা রাখার পর ঈদুল ফিতরের উৎসব পালন করা হয়। অন্য দিকে ঈদুল আযহা পশু কুরবানী, আত্নীয়-স্বজনদের কুরবানী করা পশুর গুসতো বিতরনের মাঝে পালন করা হয়।

ঈদের প্রস্ততি

ঈদের পূর্ব থেকেই ঈদের প্রস্ততি শুরু হয়ে যায়। ঈদের বিশেষ পোশাক তৈরী বা কেনার মাধ্যমে ঈদের প্রস্ততি শুরু হয়ে থাকে। ঈদ উৎসবে বাংলাদেশের পুরুষরা পাঞ্জাবি -পায়জামা পরিধান করা থাকে। এছাড়া ঈদের পোশাক হিসেবে শেরওয়ানীরও প্রচিলিত রয়েছে।

ঈদ উৎসবে নারীদের পোশাক হিসেবে প্রধান পছন্দ শাড়ি। বর্তমানে ঈদ পোশাক হিসেবে সালোয়ার কামিজ ও বেশ জনপ্রিয়তা পেয়েছে। ঈদ উৎসবে বাংলাদেশের আত্নীয়স্বজন ও পরিচিতিদেরকে পোশাক ও অন্যান্য বস্তু উপহার দিয়ার প্রথা চালু আছে।

ঈদুল আযহায় বিশেষ করে গ্রাম ও শহরঞ্চলের কুরনানীর পশু ক্রয়-বিক্রয়ের জন্যে বাজার বসে থাকে। ঈদের পূর্বে মানুষ এই সকল বাজার থেকে কুরবানীর পশু ক্রয় করে থাকে।

ঈদের শুভেচ্ছা কার্ড

বাংলাদেশের ঈদ উপলক্ষে বন্ধু-বান্ধব এবং আত্নীয় স্বজনদের মাঝে ঈদ কার্ড দেওয়ার প্রচলন আছে। বিশেষত শিশুরা তাদের বন্ধ-বান্ধব্দের এই ধরনের ঈদ কার্ড দিয়ে শুভেচ্ছা জানাতে বেশি ইচ্ছুক। বহু পূর্বথেকেই ঈদ কার্ড আদান প্রদানের সংস্কৃতি প্রচলিত আছে। তবে বর্তমানে সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে কারনে এখন এই চল অনেকটা কমে গেছে।

বাড়ী ফেরা

বাংলাদেশের জনসাধারনের এক বিরাট অংশ পেশাগত কারনে বা অন্যান্য বিভিন্ন কারনে নিজ বাড়ী ছেড়ে ঢাকা, চট্রগ্রামসহ বিভিন্ন বড় বড় শহরে বসবাস করে। ঈদের বিশেষ ছুটিতে পরিবার আত্নীয় স্বজনের সাথে ঈদ পালনের জন্যে নিজ বাড়িতে ফিরে।ঈদে নিজ বাড়িতে ফেরার প্রবনতা এতো বেশি যে আগেথেকে কনো ব্যবস্থা না করলে পরে যাওয়া সম্ভব হয়না।
সকলেই নিজ বাড়ীতে ফেরার জন্য এতই উদগ্রীব থাকে যে, সকল প্রকার যানবহন অনেকসময় নিজেদের সামর্থে্যর অধিক যাত্রী নিয়ে গন্তব্য স্থানে যাত্রা করে।

চাঁদ রাত

ঈদুল ফিতরের একটি বিশেষ আনন্দ ঈদের নতুন চাঁদ দেখা। সাধারণত গ্রামাঞ্চালে সন্ধ্যার বহু আগে থেকেই সকলের দৃষ্টি আকাশের দিকে থাকে। আকাশে ঈদের চাঁদ দেখা যাওয়ার সাথে সাথে ঈদের আনন্দ শুরু হয়ে যায়। এর মাধ্যমে সকলেই নিশ্চিত হয় পরদিন ঈদ। যদি চাঁদ দেখা না যায়, তবে পরদিন ঈদ না হয়ে তার একদিন পরে ঈদ অনুষ্ঠিত হয়। চাঁদের সাথে সম্পর্ক করে ঈদের আগের রাতটি বাংলাদেশে সাধারণভাবে চাঁদ রাত নামে পরিচিত।

মেহেদী উৎসব

ঈদের আগের দিন বাংলাদেশের শহর-গ্রামের নারী ও শিশুরা সাধারণভাবে নিজেদের হাতে মেহদি দিয়ে বিভিন্ন নকশা আঁকে। পরিবারের সদস্যরা নিজেদের হাত রাঙানোর জন্য ঈদের আগের দিন পারিবারিকভাবে বিশেষ মেহদি উৎসবের আয়োজন করে।

ঈদের দিন

ঈদের দিন সকালে উঠে ভালভাবে গোসল করার মাধ্যমে ঈদের জন্য সকলের প্রস্তুতি গ্রহণ শুরু হয়। গোসলের পর ঈদের বিশেষ পোশাক পরিধান ও সুগন্ধী লাগানোর মাধ্যমে ঈদ উৎসব পালনের জন্য প্রস্তুতি সম্পন্ন হয়।

ঈদের দিন সকালে ঈদের বিশেষ দুই রাকাত নামাজ জামায়াতের সাথে ঈদগাহে বা বিশেষক্ষেত্রে মসজিদে আদায় করা হয়। শহরাঞ্চলে খুব সকালেই ঈদের নামাজ আদায় করা হলেও গ্রামাঞ্চলে একটু বেলা করে ঈদের নামাজ আদায় করা হয়। তবে দ্বিপ্রহরের পূর্বেই নামাজ আদায় করা হয়।

ঈদুল ফিতরে ঈদের নামাজের পূর্বে দরিদ্রদের ঈদের আনন্দে শরীক করার জন্য সামর্থবানরা বিশেষ ফিতরা প্রদান করে।

ঈদের নামাজের পর সকলেই আত্মীয়-স্বজন, বন্ধু-বান্ধব ও প্রতিবেশীর বাড়ীতে পারস্পারিক সাক্ষাতের জন্য যায়। এছাড়া মৃত ব্যক্তিদের মাগফেরাতের জন্য কবরস্থানে গিয়ে বিশেষ দোয়া করা হয়।

ঈদের দিন বড়রা ছোটদেরকে ঈদের বিশেষ উপহার ও ঈদি প্রদান করে। শিশুদের মধ্যে ঈদের বিশেষ ঈদির পরিমাণ নিয়ে প্রতিযোগিতা চলে।

ঈদুল আযহার দিন নামাজের পর সামর্থ্যবানরা পশু কুরবানী করে। কুরবানী করা পশুর গোশত নিজেরা খাওয়ার পাশাপাশি আত্মীয়-স্বজন, বন্ধু-বান্ধব ও দরিদ্রদের মধ্যে বিতরণ করা হয়।

ঈদের বিশেষ খাবার

যেকোন উৎসবেই খাবার একটি মৌলিক আকর্ষণ। ঈদও এক্ষেত্রে ব্যতিক্রম নয়। ঈদের বিশেষ খাবারের আয়োজনে বাংলাদেশের নারীরা ঈদের আগের থেকেই প্রস্তুতি শুরু করেন।

ঈদের বিশেষ আয়োজনের মধ্যে সেমাই, পায়েশ. জর্দা, মিষ্টি, বিভিন্ন প্রকার পিঠা প্রভৃতি মিষ্টান্ন বিশেষভাবে উল্লেখযোগ্য। এছাড়াও নুডলস, পাস্তা, চটপটি, হালিমের পাশাপশি পোলাও, বিরিয়ানী, কোর্মা, কালিয়া, কাবাব, কোপ্তা প্রভৃতির আয়োজন করা হয়।

ঈদুল আযহার সময় পশু কুরবানী করায় কুরবানী করা পশুর গোশতের বিভিন্ন আয়োজন বিশেষভাবে করা হয়। গোশতের এই বিভিন্ন আয়োজন পরোটা, চাল বা আটা দ্বারা তৈরি করা রুটির সাথে পরিবেশন করা হয়। এছাড়াও বিভিন্ন প্রকার মিষ্টান্নের আয়োজন করা হয়।

বাংলাদেশে ঈদের বিশেষ উৎসব তিনদিন থেকে এক সপ্তাহ পর্যন্ত চলে। এসময় সকলে নিজেদের আত্মীয়-স্বজন, পরিবার-পরিজন, বন্ধু-বান্ধব ও প্রতিবেশীদের বাড়ীতে সাক্ষাত করতে যায়। এভাবে পারস্পারিক সাক্ষাত ও বিশেষ খাবারের আয়োজনের মাধ্যমে ঈদের আয়োজন সম্পন্ন হয়। ঈদের উৎসব শেষে সকলেই আবার নিজেদের কর্মস্থলে ফিরে আসে এবং নিজেদের দৈনন্দিন ব্যস্ততায় জড়িয়ে পরে।

You may also like...

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *