শাড়ির ইতিহাস

বাঙালির শাড়ির ইতিহাস নতুন বাকের সন্ধান পায় মূলত মোঘল সম্রাজ্যের শুরোস্নাতো তুর্কি, আফগান, মোগল, সংস্কৃতির প্রভাবে বাঙালী মেয়েদের পোশাকের ক্ষেত্রে বিসত্মর পরিবর্তন ঘটে। তখনই প্রচলিত হতে থাকে বেরংয়ের শাড়ির। তখনকার বাঙালী নারি দের পছন্দের শড়ি ছিলো লাল ডুরে। আজকের দিনে যেটাকে আমরা বলি চোলি বা কাচুলি সেই সময় মেয়েদের কাছে তা প্রচলিত ছিলো আঙ্গিয়া নামে।সেই সময়ের শাড়ি পরার ঢং ও কাচুঁলিকে ঘিরে নানা রকম বিষয় সাহিত্যের আবির্তিত রয়েছে। তবে এই শাড়ি সাধারণের কাছে আরো বাশি বর্ণময় হয়ে উঠলো যখন শাড়ির ধরণ টা বদলে শাড়ি হয়ে উঠলো ষোল হাতের।সেই সময় সারা দেশে মিস্ময় হয়ে তৈরি হলো ঢাকাই মুসলিন। শেষে দেখা গেলো এই বিস্ময়ই কাল হয়ে উঠলো বাংলার জন্যে।শাড়ির টানে ইউরোপীয় বণিকেরা ছুটে এলো ব্যবসা ফাদে। ইতিহাস ঘাটলে দেখা যায় শাড়ির বিবর্তনের মুসলিনের উৎপত্তি এদেশে বিদেশী-সম্রাজ্য গড়ে উঠার অন্যতম নৈপথ্যের কারন। মোঘল শাসন কালে শড়ি বোননে আছে নানা বৈচিত্র, মসলিন কারিগর বা তাঁতীরা নিজেদের আরো বেশি মনোনিবেশ করলেন এ কাজে৷ ইংরেজ শাসন যখন পাকাপোক্ত হল তখন কেবল শাড়ি পরার ধরনে নয়, শাড়ির সাথে সায়া, সেমিজ, বস্নাউজেরও চল শুরম্ন হল৷

ভারত বিভাগের পূর্বে এদেশে নারীরা আধুনিক শাড়ি পরার চলন-বলন শিখেছেন মূলত ঠাকুর বাড়ির কল্যাণে৷ রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের ভাই সত্যেন্দ্রনাথের স্ত্রী জ্ঞানদানন্দিনীর অবদানের কথা এৰেত্রে স্মরণ করতে হয়৷ ভারত বিভাগের পর পাকিসত্মানী আমল শুরম্ন হলেও শাড়ির আবেদন কিন্তু কমেনি কোনো অংশে৷ এ সময় তাঁতের সুতি শাড়ির আধিপত্যটাই বেশি ছিল৷ সাথে ছিল টিসু্যর ব্যবহার৷ শাড়ির স্টাইলিশ রূপটি আমরা দেখতে পাই ৬০’এর দশকে৷ কারণ ফ্যাশন বা লুক যাই বলি না কেন সাজ-পোশাক নিয়ে বিভিন্ন এক্সপেরিমেন্ট এ দশকেই দেখা যায়৷ শাড়ির অাঁচল ছোট করে পড়া, ‘ িভলেস বস্নাউজ দিয়ে শাড়ি পরার প্রচলনটি জনপ্রিয় হয় এ সময়৷ এছাড়া তত্‍কালীন সিনেমার নায়িকাদের স্টাইলই ছিল অনুসরণীয়৷ একদিকে সুচিত্রা সেন, মালা সিনহা, শর্মিলা ঠাকুর, সন্ধ্যা রায়, সাবিত্রী অন্যদিকে কবরী, সুচন্দা, সুজাতাদের সাজ-সজ্জাই অনুকরণ করতেন তত্‍কালীন নারীরা৷ শাড়ি পরার স্টাইল যেমন অনুকরণ করা হতো, তার চেয়ে বেশি বস্নাউজের ছাঁট-কাটের দিকে দৃষ্টি ছিল৷ সুতির পাশাপাশি সিল্কের শাড়িও জনপ্রিয় হয়ে উঠতে শুরম্ন করে এ সময়৷ সত্তরের দশককে আমরা বলতে পারি ‘যেমন খুশি তেমন সাজো’ দশক৷ শাড়ির সাথে কনট্রাস্ট এবং গোল গলা আর লম্বা হাতের বস্নাউজের ফ্যাশনটিও চালু হয় এ সময়৷ তবে প্রাক আশির দশক থেকে শাড়ির ফেব্রিক্স ও বুননে ভিন্নতার ছোঁয়া পরিলৰীত হয়৷ মসলিন, জামদানী, জর্জেট, কাতানের পাশাপাশি সুতির উপর এক্সপেরিমেন্টাল কাজের ট্রেন্ডও চালু হয়৷ নব্বই দশক থেকে পরবর্তী দেড় দশকের শাড়ির ডিজাইনে বস্নক, হ্যান্ডপেইন্ট, স্প্রে, বাটিক, সিকোয়েন্স, ডলারব্যবহৃত হতে থাকে৷ পরবর্তীতে এ ডিজাইনগুলোর সঙ্গে আরো যুক্ত হয় অ্যাপিস্নক, কারচুপি, ফ্লোরাল মোটিভ প্রভৃতি৷

সুতি শাড়ি

আবহমানা কাল থেকেই বাঙালী নারীরা সুতি শাড়িতে অদ্বীতিয়া। কালের আবর্তে নানা ফেব্রিকের সংযোজন বিয়োজন হলেও সুতি শড়ির আবেদন এক চুল ও কমেনি বরং উত্তোরত্তর এর কদর বৃদ্ধি পাচ্ছে। বাংলাদেশে সবচেয়ে বেশী সুতি উৎপাদিত হয় পাবনা, সিরাজগঞ্জ,টাঙ্গাই জেলায়। এছাড়া ঢাকা এবং কুমিল্লাতেও স্বল্প পরিমান সুতি কাপড় উৎপাদন করা হয়। তবে সুতি কাওপড়ের কথা শুনলেই টাঙ্গাইলের কথা উঠে আসে। টাঙ্গাইলের পাথরাইল, বিষ্ণুপুর, দেলদুয়ার, বাজিতপুর প্রভৃতি জায়গা জুড়ে রয়েছে বিরাট তাঁত অঞ্চল৷ সুতি কাপড় তৈরির জন্য রয়েছে বিভিন্ন রকমের তাঁত৷ যার মধ্যে পাওয়ার লুম, পিট লুক, জামদানী, চিত্তরঞ্জন ইত্যাদি তাঁত উলেস্নখযোগ্য৷ সীসা দিয়ে ঝোলানো সারি সারি সুতা সাজিয়ে পা দিয়ে তাঁত চালিয়ে ডিজাইন অনুসারে সুতা উঠানামা করা হয়৷ এক প্রস্থ সুতা থাকে উপরের দিকে আরেক প্রস্থ নীচের দিকে৷ এ দুই সারি সুতার মাঝখানে দিয়ে মাকু চালিয়ে ভরে দেয়া হয়৷ বিভিন্ন রঙের সুতা দিয়ে এইভাবে তৈরি করা হয়। ডিজাইন ভেদে আরাই হাত প্রস্থ এবং বারো হাত দৈর্ঘ একটি শড়ি তৈরি করতে তাদের সময় লাগে এক থেকে দশদিন। সুতি শাড়ির উপর বস্নক, বাটিক,জল ছাপ, হালকা অ্যামব্রয়ডারির পাশাপাশি হ্যান্ডপেইন্ট, অ্যাপিস্নক, সিকোয়েন্স প্রভৃতি ডিজাইনও বেশ জনপ্রিয়৷

জামদানি

আমাদের ঐতিহ্যের ধারক বাহক হিসেবে জামদানি শাড়ির অবস্থান সবকিছুর উপরে। মোঘল সম্রাজ্যে জামদানি শাড়ির উত্‍কর্ষতার চরম শিখরে পৌছে যায়। ঐ সময় পুরুষ-মহিলা সকলের পোষাকেই জামদানি ডিজাইন পরিলক্বিত হতো। সে সময়ে ইউরোপীয়ানরা চিত্রকলার দরবার ভার্সিলি এবং লন্ডনের মহিলাদের পোশাকে জামদানি গজ কাপর ব্যবহার করতে দেখা যায়। পঞাদশ ও ষোড়শ সতাব্দিতেও রাজ দরবারে জামদানি ব্যবহার করা হতো। জামদানি তৈরিতে কারিগরি দবতারের চেয়ে ডিজাইনিং ও সৃজনশীলতা ও শৈল্পিক দবতাটা জরম্নরি ।জামদানির আবেদন এখনো অমলিন৷ এর পেছনে জামদানির ডিজাইনে জ্যামিতিক প্যাটার্নের ধারাবাহিকতা ও বুননের বিষয়টিই ঘুরে-ফিরে প্রাধান্য পায়৷ ঢাকার রূপগঞ্জ, সোনারগাঁও এবং সিদ্ধিরগঞ্জের প্রায় ১৫০টি গ্রামে এ শিল্প টিকে আছে৷ জামদানির পাড় ও আঁচলের নানা নকশার মধ্যে কলকা, আংটি, শামুক, ময়ূর পেখম, তাজেল, কাজল লতা, সন্দেশ, পানকী, পানপাতা প্রভৃতি উলেস্নখযোগ্য৷ জামদানীর জমিনের নকশা বুটা, জাল ও তেছরি এ তিন ভাগে বিভক্ত৷ জমিনের নকশার মধ্যে হাজার তারা, মটর দানা, নয়ন সুখ, ময়ূর জোড়া, কদম বাহার, জীবন তারা, সঙ্খমতি, কলসী ফুল, গজ মতি প্রভৃতি উলেস্নখযোগ্য৷

কাতান

সুতি, জামদানির মতো অদ্বিতীয় এক শাড়ির নাম কাতান৷ বেনারসির আরেকটি ধরন বলা যেতে পারে কাতানকে৷ এক সময় বিভিন্ন উত্‍সব-পার্বণে নারীদের প্রথম পছন্দই ছিল কাতান৷ হালকা কাজের দেশি কাতানের ছিল ব্যাপক চাহিদা৷ বর্তমানে কাতানের চাহিদা খানিকটা পড়তির দিকে হলেও নিজেদের সংরৰণে বাহারী কাতান রাখতে পছন্দ করেন এমন নারীর সংখ্যাই বেশি৷ কাতানের ডিজাইনিং এ চিকন পাড় ও শাড়ি জুড়ে কলকা বিশিষ্ট মোটিভের চলই এখন বেশি৷ মিরপুরের কাতানের বাইরেও টাঙ্গাইলের তাঁতিরা তৈরি করছে ফুল সিল্ক টাঙ্গাইল কাতান, এছাড়া বালুচুরি, গাদোয়ান শাড়িও চল রয়েছে৷ চিকন পাড় ও পেটানো কাজের আঁচল বিশিষ্ট কাতান শাড়িও জনপ্রিয়৷ লাল-কালো, মেরম্নন, কমলা, ফিরোজা, পেঁয়াজ রঙগুলোই কাতানে ঘুরে ফিরে দেখা যায়৷ এক রঙা কাতানে চওড়া ও চিকন পাড়ের জনপ্রিয়তা এখন বেশি হলেও ভেতরে কারম্ন-কার্যময় শাড়ির জনপ্রিয়তাও রয়েছে৷ কাতান শাড়ির মূল ৰেত্রটি মিরপুর ১০ নম্বরের বেনারসি পলস্নী৷ এছাড়া কাতান শাড়ি কিনতে ঢুঁ মেরে আসতে পারেন টাঙ্গাইলে৷

এবারের ট্রেন্ড

বিশেষ দিবসের বিশেষ ট্রেন্ড হিসেবে শাড়ি যে নারীর প্রথম পছন্দ তা আর বলার অপেৰা রাখে না৷ এবারের ঈদেও এর ব্যতিক্রম হবে না৷ নারীর ভূষণে ভিন্ন মাত্রা যোগ করতে শাড়ির ডিজাইনে ও ফেব্রিকে ভিন্নতা দেখা যাবে৷ সূতি শাড়ির মধ্যে বাহারী ডিজাইন ও মোটিভের প্রচলন রয়েছে এবার৷ ডলার, সিকোয়েন্স, বস্নক, বাটিকের পাশাপাশি এবার অ্যাপিস্নক ও কারচুপির প্রাধান্য দেখা যাবে৷ এছাড়া কোটা মসলিন শাড়িতে কারচুপি ও হাতের কাজ, হাফ সিল্ক শাড়ির অাঁচল ও পাড়ে এমব্রয়ডারি ও চুমকির কাজ, মটকা কটন শাড়ি অাঁচল ও কুচিতে অ্যাপিস্নক ও এমব্রয়ডারির কাজ, বডিতে অ্যান্ডিকটন ও অাঁচলে জয় সিল্ক, টাঙ্গাইল শাড়িতে বুটির কাজ, চেক কাপড়ে হ্যান্ড অ্যাপিস্নক, তাঁত ও এন্ডি সিল্কের সমন্বয়ে অ্যাপিস্নক কারচুপি ও বস্নকের কাজ, জর্জেট শাড়িতে ফ্লোরাল মোটিভে কারচুপি প্রভৃতি৷ এসব শাড়ির মূল্য ৩০০০ থেকে ৬০০০ টাকার মধ্যে৷ এছাড়া ফ্রেনতে শিফন, সিল্ক শিফন, প্রিন্টেড শিফন, জর্জেট, ক্রেপ জর্জেট, নাইলন জর্জেট, মাইসের সিল্ক, কাঞ্জিভরম, কোটকী শাড়ি, ক্যাম্পল শাড়ি, অর্গাঞ্জা শাড়িগুলোর চলও রয়েছে৷ এ শাড়িগুলোর দাম পড়বে ২০০০ থেকে ৮০০০ টাকার মধ্যে৷

You may also like...

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *